ফ্রান্সজুড়ে ৭০ হাজার পুলিশ মোতায়েন, বিক্ষোভে কঠোর অবস্থানে ম্যাক্রোঁ সরকার
- আপডেট সময় : ১১:৫৬:৪৯ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬ ২ বার পড়া হয়েছে
বিক্ষোভ ও সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে ফ্রান্সজুড়ে ৭০ হাজার পুলিশ সদস্য মোতায়েন করেছে প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর নেতৃত্বাধীন সরকার। গত সপ্তাহের বিক্ষোভে সহিংসতা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে শনিবার, ২৪ অক্টোবর, এই নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। গত সপ্তাহের শনিবারের তুলনায় এবার প্রায় ১০ হাজার বেশি পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।
ফরাসি সংবাদমাধ্যমের বরাত দিয়ে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরা জানিয়েছে, শুক্রবার শীর্ষ মন্ত্রী ও কর্মকর্তাদের নিয়ে গঠিত প্রতিরক্ষা পরিষদের সঙ্গে বৈঠক করেন ম্যাক্রোঁ। নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গেও তাঁর আলোচনার পরিকল্পনা ছিল। প্রতিরক্ষা পরিষদের বৈঠকের পর আরও কিছু সিদ্ধান্ত ঘোষণার কথা জানিয়েছিল প্রেসিডেন্টের দপ্তর।
ম্যাক্রোঁ সাম্প্রতিক অস্থিরতার জন্য ‘উগ্র-বামপন্থী’ গোষ্ঠীগুলোকে দায়ী করেছেন। তাঁর অভিযোগ, এসব গোষ্ঠী সহিংসতার মাধ্যমে প্রজাতন্ত্রকে দুর্বল করার চেষ্টা করছে।
৭০ হাজার নিরাপত্তাকর্মী, বিশেষায়িত ইউনিটও প্রস্তুত
শুক্রবার ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ জানান, শনিবার দেশজুড়ে প্রায় ৭০ হাজার নিরাপত্তাকর্মী দায়িত্ব পালন করবেন। তাঁদের সঙ্গে থাকবে পুলিশের বিশেষায়িত ও এলিট ইউনিট, অশ্বারোহী পুলিশ, হেলিকপ্টার, ড্রোন, সাঁজোয়া যান এবং জলকামান।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরকারি ভবন লক্ষ্য করে হামলা ও লুটপাটের আহ্বান জানানো হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন নুনেজ। তিনি বলেন, “দাঙ্গাবাজ, লুটতরাজকারী এবং যারা সহিংসতায় লিপ্ত হবে, তাদের প্রতি আমরা কোনো নমনীয়তা দেখাব না।”
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ভাষ্য, এবারের পরিস্থিতিকে সাধারণ বা শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। নিরাপত্তা বাহিনী অত্যন্ত সতর্ক ও কঠোর অবস্থানে থাকবে। গত সপ্তাহে সংবেদনশীল কিছু এলাকায় যে কারফিউ জারি করা হয়েছিল, তা বহাল থাকবে বলেও জানান তিনি।
বিক্ষোভের অনুমতি নিয়ে বিতর্ক
বৃহস্পতিবার ম্যাক্রোঁ ঘোষণা দেন, শনিবার কেবল শ্রমিক ইউনিয়নগুলোর বিক্ষোভের অনুমতি দেওয়া হবে। সরকারের এ সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছে বিভিন্ন ছাত্রসংগঠন। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে স্কুলের অবকাঠামো ও শিক্ষাব্যবস্থার পরিস্থিতি নিয়ে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন শুরু হলেও পরে জীবনযাত্রার উচ্চ ব্যয়সহ নানা বিষয়ে অসন্তোষ প্রকাশকারী গোষ্ঠীগুলোও এতে যুক্ত হয়।
গত শনিবার ফ্রান্সজুড়ে পাঁচ লাখের বেশি মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন। তবে কর্মসূচির একপর্যায়ে বিভিন্ন স্থানে সহিংসতা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে।
রাজধানী প্যারিসের কিছু এলাকায় রাতের কারফিউ সোমবার পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। দেশটির গুরুত্বপূর্ণ শহর লিওঁতে কেন্দ্রীয় এলাকায় জনসমাগমে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। শনিবারের জন্য সেখানে কারফিউ ও গণপরিবহন চলাচলেও বিধিনিষেধ রয়েছে।
উপকূলীয় শহর মার্সেইতে বিক্ষোভ নিষিদ্ধ করা হলেও শুক্রবার কর্তৃপক্ষ বিশেষ বিবেচনায় একটি শ্রমিক ইউনিয়নের মিছিলের অনুমতি দেয়।
শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বৈঠকেও অসন্তোষ
শুক্রবার প্রথমবারের মতো হাইস্কুল শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন ম্যাক্রোঁ। ‘হাইস্কুল রিনিউয়াল’ নামের শিক্ষার্থী সংগঠনের সভাপতি নাথানায়েল কম্বারি জানান, প্রেসিডেন্ট তাঁদের বক্তব্য মনোযোগ দিয়ে শুনেছেন। তবে শিক্ষার্থীরা সোমবার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব পাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন।
কম্বারি বলেন, “প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠক করে আমরা সন্তুষ্ট নই।” শিক্ষার্থীদের সংগঠিত হওয়ার এবং আন্দোলনের পরিকল্পনা অব্যাহত রাখার আহ্বানও জানান তিনি।
শিক্ষার্থীদের দাবি, স্কুলের অবকাঠামো ও শিক্ষার পরিবেশের উন্নয়নসহ তাঁদের উত্থাপিত সমস্যাগুলোর বাস্তবসম্মত সমাধান দিতে হবে।
ছাত্র ইউনিয়ন ও ‘ইয়েলো ভেস্টের’ কর্মসূচি
বিভিন্ন বিধিনিষেধের মধ্যেও ফ্রান্সের জাতীয় ছাত্র ইউনিয়ন ইউএনইএফ শনিবার সমাবেশের ডাক দিয়েছে। ২০১৮ সালে আত্মপ্রকাশ করা সরকারবিরোধী আন্দোলন ‘ইয়েলো ভেস্ট’ও প্যারিসের কেন্দ্রস্থলে পদযাত্রার পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্যারিসে পুলিশ শ্রমিক ইউনিয়নের একটি বিক্ষোভের অনুমতি দিলেও ইউএনইএফ ও ইয়েলো ভেস্ট আন্দোলনের সমাবেশের আবেদন প্রত্যাখ্যান করেছে। তবে ইউএনইএফ জানিয়েছে, তারা কর্মসূচি চালিয়ে যাবে।
ইউএনইএফের অভিযোগ, ম্যাক্রোঁ সরকার বিক্ষোভ করার স্বাধীনতা খর্ব করছে এবং প্রজাতন্ত্রের মূল্যবোধের প্রতি অসম্মান দেখাচ্ছে।
অরলিয়ঁতে পাল্টাপাল্টি বিক্ষোভের আশঙ্কা
রাজধানী প্যারিসের দক্ষিণে অরলিয়ঁ শহরে বিরোধীদলীয় নেত্রী মেরিন ল্য পেনের কট্টর ডানপন্থী দল ন্যাশনাল র্যালি তাদের দলীয় কংগ্রেস আয়োজন করছে। এর প্রতিবাদে সেখানে ২০ হাজার থেকে ৩০ হাজার মানুষ বিক্ষোভ করতে পারেন বলে ধারণা করছে স্থানীয় প্রশাসন। তবে শহরের কেন্দ্রস্থলে এই জমায়েতের অনুমতি দেওয়া হবে না বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
দলটির কংগ্রেসকে কেন্দ্র করে সমর্থক ও বিরোধীদের মধ্যে সংঘাতের আশঙ্কায় নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।
মানবাধিকার সংস্থার উদ্বেগ
বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে সরকারের নেওয়া বিধিনিষেধের সমালোচনা করেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। সংস্থাটি এসব পদক্ষেপকে ‘কর্তৃত্ববাদী আচরণের দিকে ঝুঁকে পড়া’ হিসেবে অভিহিত করেছে। তাদের মতে, এ ধরনের বিধিনিষেধ শান্তিপূর্ণভাবে বিক্ষোভ করার অধিকারকে বিপন্ন করতে পারে।
ভিড় নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত অস্ত্রের আঘাতে শিক্ষার্থী ও অপ্রাপ্তবয়স্কদের গুরুতর আহত হওয়ার খবরেও উদ্বেগ জানিয়েছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ।
ফরাসি শ্রমিক সংগঠন ডেমোক্রেটিক কনফেডারেশন অব লেবার ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মারিলিস লিওঁ বলেছেন, জনগণের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের বিষয়টি বিবেচনায় নিলে বিক্ষোভের ওপর নিষেধাজ্ঞা উল্টো ফল বয়ে আনতে পারে।
বন্ধ থাকবে ল্যুভর, আগেভাগে শেষ হচ্ছে আর্ট বাসেল
নিরাপত্তাঝুঁকির আশঙ্কায় ফ্রান্সের প্রধান শহরগুলোতে দোকানপাট ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখার আহ্বান জানানো হয়েছে। শনিবার প্যারিসের বিখ্যাত ল্যুভর জাদুঘর বন্ধ থাকবে। লুই ভুইতোঁ ফাউন্ডেশনও বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া প্যারিসে আয়োজিত ‘আর্ট বাসেল’ মেলা নির্ধারিত সময়ের দুই দিন আগেই শুক্রবার শেষ হচ্ছে।
ফ্রান্সের বিচার মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত শনিবারের সহিংসতার পর থেকে এ পর্যন্ত ২ হাজার ৭০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
সূত্র: আলজাজিরা, রয়টার্স









