১৪ বছরেও চালু হয়নি বিআরটি, ২৮১১ কোটি টাকা ব্যয়ের পর প্রকল্প বাতিলের সিদ্ধান্ত
- আপডেট সময় : ১১:৫৭:০৩ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬ ২ বার পড়া হয়েছে
গাজীপুর থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত বাস র্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) প্রকল্পে ১৪ বছর ধরে নির্মাণকাজ চললেও চালু হয়নি কাঙ্ক্ষিত বাসসেবা। ব্যয় হয়েছে ২ হাজার ৮১১ কোটি টাকা। এবার প্রকল্পের অবকাঠামো অপসারণ করে সড়কটিকে ছয় লেনের সাধারণ মহাসড়কে রূপান্তরের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। একই সঙ্গে প্রকল্প বাস্তবায়ন ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা ঢাকা বাস র্যাপিড ট্রানজিট পিএলসি বিলুপ্ত করে এর কার্যক্রম সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের (সওজ) আওতায় নেওয়া হবে।**
সরকারের এ সিদ্ধান্ত নিয়ে আপত্তি তুলেছেন পরিবহন ও পরিকল্পনা বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ। তাঁদের মতে, প্রায় সম্পন্ন একটি গণপরিবহন প্রকল্প বাতিলের আগে এর পরিচালনাগত সমস্যা, বিকল্প ব্যবস্থার সম্ভাবনা এবং সিদ্ধান্তের পেছনে সম্ভাব্য স্বার্থের সংঘাত খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
গত রোববার (১৮ অক্টোবর) অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে বিআরটি প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পরদিন সোমবার (১৯ অক্টোবর) সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের উপসচিব তাসলিমা আহমেদ পলির সই করা চিঠিতে পরবর্তী করণীয় জানানো হয়।
চিঠিতে বলা হয়েছে, বিআরটি করিডরের স্টেশন, লেন বিভাজকসহ অন্যান্য অবকাঠামো অপসারণ করে সড়কটিকে দুই দিকে তিনটি করে মোট ছয় লেনের সাধারণ মহাসড়কে রূপান্তর করা হবে। পাশাপাশি প্রকল্পের আওতায় নির্মিত দুটি দুই লেনের ওভারপাস চার লেনে উন্নীত করার কার্যক্রম নেওয়া যেতে পারে।
প্রকল্পটি আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ করতে সংশ্লিষ্ট উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে আলোচনা করে বিদ্যমান আইনি জটিলতা নিরসন করতে হবে। এরপর প্রকল্পের সমাপ্তি ঘোষণা বা ‘প্রজেক্ট ক্লোজার’-এর প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে।
সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জরুরি ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের নির্দেশ দিয়েছে। আগামী ১৫ দিনের মধ্যে অগ্রগতি প্রতিবেদন জমা দিতে হবে। কার্যক্রম শেষ না হওয়া পর্যন্ত প্রতি মাসের ৩ তারিখের মধ্যে অগ্রগতি প্রতিবেদন দিতে হবে।
চার বিকল্পের মধ্যে বেছে নেওয়া হলো প্রকল্প বাতিল
বিআরটি প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে চারটি বিকল্প বিবেচনায় নেওয়া হয়েছিল। এগুলো হলো—প্রকল্পের অবশিষ্ট কাজ শেষ করে বাসসেবা চালু করা, ফ্র্যাঞ্চাইজিভিত্তিক বাস রুট পরিচালনা, সড়কটিকে এক্সপ্রেসওয়েতে রূপান্তর এবং বিআরটির অবকাঠামো অপসারণ করে সাধারণ মহাসড়ক নির্মাণ।
শেষ পর্যন্ত চতুর্থ বিকল্পটি বেছে নিয়েছে সরকার। অর্থাৎ, যে বিশেষায়িত বাসসেবা চালুর উদ্দেশ্যে প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছিল, সেটি আর বাস্তবায়িত হচ্ছে না। এর পরিবর্তে বিদ্যমান অবকাঠামোর একটি অংশ অপসারণ করে সড়কটি সাধারণ যানবাহন চলাচলের উপযোগী করা হবে।
১৪ বছরে ব্যয় ২ হাজার ৮১১ কোটি টাকা
গাজীপুর থেকে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর পর্যন্ত বিআরটি প্রকল্পের কাজ শুরু হয় ২০১২ সালে। প্রকল্পটির প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছিল ৪ হাজার ২৬৮ কোটি ৩২ লাখ টাকা। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে নির্ধারিত সময়সীমা শেষ হলেও বাসসেবা চালু করা যায়নি।
প্রকল্পের অবকাঠামোগত কাজের অগ্রগতি প্রায় ৯৭ শতাংশে পৌঁছেছিল। তবে সার্বিক ভৌত অগ্রগতি ছিল ৭৭ দশমিক ৪৮ শতাংশ। এ পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে ২ হাজার ৮১১ কোটি টাকা। এরপর প্রকল্পের মেয়াদ আর বাড়ানো হয়নি।
প্রকল্পটির মূল লক্ষ্য ছিল ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের গাজীপুর থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত অংশে যানজট এড়িয়ে দ্রুত যাতায়াতের জন্য পৃথক লেনে বিশেষ বাস চালু করা। কিন্তু দীর্ঘ নির্মাণকাজ, অবকাঠামো ও পরিচালনাসংক্রান্ত জটিলতার কারণে সেই লক্ষ্য পূরণ হয়নি।
এ রুটে চলাচলের জন্য দুই দফায় বাস কেনার উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা সফল হয়নি। ফলে দীর্ঘদিন ধরে নির্মিত অবকাঠামো থাকলেও যাত্রীদের জন্য নির্ধারিত বিআরটি সেবা চালু করা সম্ভব হয়নি।
‘প্রকল্প চালুর অনীহার পেছনে বিশেষ স্বার্থ আছে কি না, খতিয়ে দেখা প্রয়োজন’
ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (ডুয়েট) সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. খসরু মিয়া সরকারের সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন।
তিনি বলেন, প্রকল্পের প্রায় ৯৭ শতাংশ অবকাঠামোগত কাজ শেষ হওয়ার পরও এর ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়া উদ্বেগজনক। প্রকল্প বাস্তবায়ন বা পরিচালনায় কারিগরি, ব্যবস্থাপনাগত কিংবা পরিচালনাগত সমস্যা থাকলে তা চিহ্নিত করে সমাধান করা প্রয়োজন। পরিচালনাপদ্ধতিতে সমস্যা থাকলে তা পরিবর্তন করতে হবে; যান চলাচল ব্যবস্থাপনায় জটিলতা থাকলে কার্যকর পরিকল্পনার মাধ্যমে তা নিরসন করতে হবে।
খসরু মিয়া বলেন, ঢাকার মেট্রোরেল পরিচালনায় সরকার বছরে প্রায় ৮০০ কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে প্রস্তুত থাকলেও গাজীপুরের বিআরটি চালুর ক্ষেত্রে অনীহার কারণ খতিয়ে দেখা দরকার। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে কোনো গোষ্ঠীর প্রভাব রয়েছে কি না, সেটিও অনুসন্ধান করা প্রয়োজন।
প্রকল্পের অনিয়মের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি কিংবা ব্যক্তিগত যানবাহন ও অকার্যকর বাস ব্যবসার স্বার্থ রক্ষাকারীরা বাস্তবায়নে বাধা সৃষ্টি করছেন কি না, তা-ও তদন্তের দাবি রাখে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
বিআইপির প্রতিবাদ, সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের দাবি
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সাধারণ সম্পাদক ও পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক মু. মোসলেহ উদ্দীন হাসান মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) এক বিবৃতিতে সরকারের সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেন।
বিবৃতিতে তিনি বলেন, বিআরটি প্রকল্প বাতিল, সংশ্লিষ্ট সংস্থা বিলুপ্ত এবং অবকাঠামোকে ছয় লেনের সাধারণ মহাসড়কে রূপান্তরের সিদ্ধান্তে সম্ভাব্য স্বার্থের সংঘাতের বিষয়টি সামনে এসেছে। তাঁর মতে, মন্ত্রিসভার বৈঠক-পরবর্তী নিয়মিত সংবাদ ব্রিফিংয়ে এ সিদ্ধান্তের কথা জানানো না হওয়ায় সিদ্ধান্তগ্রহণের প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন ও জল্পনার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
বিআইপি এ সিদ্ধান্তকে টেকসই, জ্বালানি-সাশ্রয়ী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক গণপরিবহনব্যবস্থার জন্য নেতিবাচক বলে অভিহিত করেছে। সংস্থাটির দাবি, সিদ্ধান্তটি ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহারকারী এবং দেশি-বিদেশি নির্মাণ খাতের লবির স্বার্থের পক্ষে গেছে। একই সঙ্গে এটি গাজীপুর ট্রান্সপোর্ট মাস্টার প্ল্যান (জিটিএমপি) এবং ঢাকার সংশোধিত কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনার (আরএসটিপি) প্রস্তাবনার পরিপন্থী।
বিআইপির মতে, নির্মাণকাজের কারণে ১৪ বছর ধরে ভোগান্তি পোহানো গাজীপুর ও উত্তরার বাসিন্দাদের যাতায়াতের চাহিদা বিবেচনায়ও সিদ্ধান্তটি প্রশ্নবিদ্ধ।
সংস্থাটি বিআরটি প্রকল্প বাতিলের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার, বিআরটি ও এমআরটি পরিচালনা এবং সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমের জন্য সমন্বিত সংস্থা গঠন এবং ঢাকা শহরসহ দেশের অন্যান্য মহানগরে বিআরটির বৃহত্তর পরিকল্পনা প্রণয়নের দাবি জানিয়েছে।
এ ছাড়া পরিবহন অবকাঠামো উন্নয়নে প্রকল্পভিত্তিক সিদ্ধান্তের পরিবর্তে পরিকল্পনাভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি অনুসরণ, সময় ও ব্যয়সাশ্রয়ী প্রকল্পকে অগ্রাধিকার এবং নারী, স্বল্প দূরত্বের যাত্রী, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও সীমিত সামর্থ্যের মানুষের জন্য কার্যকর গণপরিবহন নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে বিআইপি।
বৃহত্তর ঢাকা অঞ্চলের পরিবহন পরিকল্পনায় ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষকে (ডিটিসিএ) নেতৃত্বদানকারী সংস্থা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নিয়ন্ত্রণে ন্যস্ত করারও প্রস্তাব দিয়েছে সংস্থাটি।
এ বিষয়ে জানতে মঙ্গলবার সকালে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব ড. মোহাম্মদ জিয়াউল হককে ফোন করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।









