আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে ১৩ হাজার কোটি টাকার অভিযোগ অনুসন্ধান করছে দুদক
- আপডেট সময় : ১১:২০:০৮ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১ বার পড়া হয়েছে
সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকার আর্থিক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধান করছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। নিয়োগ-পদায়ন, বদলি ও পদোন্নতিতে অর্থ লেনদেন, টেন্ডার ও উন্নয়ন প্রকল্পে কমিশন এবং বিদেশে অর্থ পাচারের মতো অভিযোগ রয়েছে বলে দুদক সূত্র জানিয়েছে।
শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) দুদক সূত্র এসব তথ্য নিশ্চিত করেছে।
সূত্র জানায়, অভিযোগে উল্লেখ করা অর্থের মধ্যে প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা দুবাই, সিঙ্গাপুর, অস্ট্রেলিয়া ও সুইজারল্যান্ডে পাচারের কথা বলা হয়েছে। বাকি অর্থের অভিযোগ রয়েছে বিভিন্ন নিয়োগ-পদায়ন, টেন্ডার, উন্নয়ন প্রকল্প ও ঘুষ লেনদেনকে কেন্দ্র করে।
তবে এসব অভিযোগের সত্যতা এখনো প্রমাণিত হয়নি। অনুসন্ধানের মাধ্যমে অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করবে দুদক।
এর আগে গত ২ সেপ্টেম্বর আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াসহ চারজনের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধান শুরু করে দুদক। ওই অনুসন্ধানে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে নিয়োগ, বদলি, কেনাকাটা ও বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। নতুন অভিযোগগুলো আগের অনুসন্ধানের সঙ্গে যুক্ত করে তদন্তের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে দুদক সূত্র জানিয়েছে।
ডিসি পদায়ন ও সিটি করপোরেশনে নিয়োগের অভিযোগ
দুদকে দেওয়া অভিযোগে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে প্রশাসক নিয়োগে প্রায় ৬০ কোটি টাকা লেনদেনের অভিযোগ করা হয়েছে।
এ ছাড়া সারা দেশে ৩৬ জন জেলা প্রশাসক (ডিসি) পদায়নে ২ কোটি থেকে ১০ কোটি টাকা পর্যন্ত লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগে উল্লেখিত অঙ্ক অনুযায়ী, ৩৬ জনের ক্ষেত্রে সম্ভাব্য লেনদেনের পরিমাণ ৭২ কোটি থেকে ৩৬০ কোটি টাকা হতে পারে। বিষয়টি অনুসন্ধানের মাধ্যমে যাচাই করবে দুদক।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন, নারায়ণগঞ্জ ও কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের টেন্ডার কার্যক্রমেও আসিফ মাহমুদের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ করা হয়েছে। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব পালনের সময় বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের টেন্ডার থেকে ১০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
প্রকল্প ব্যয় বাড়ানোর অভিযোগ
স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অধীনে গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন ও সেতু নির্মাণ প্রকল্পে ব্যয় বাড়িয়ে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। ঢাকা ওয়াসার সায়েদাবাদ পানি শোধনাগার প্রকল্পের তৃতীয় ধাপে অস্বাভাবিক ব্যয় বৃদ্ধি এবং শেখ রাসেল মিনি স্টেডিয়াম প্রকল্পে ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা ব্যয় বাড়ানোর অভিযোগও অনুসন্ধানের আওতায় রয়েছে।
এ ছাড়া আসিফ মাহমুদের নিজ উপজেলা মুরাদনগরের গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পে ৪৫৩ কোটি টাকা বরাদ্দ এবং ওই অর্থ গ্রহণ ও ব্যবহারের প্রক্রিয়া নিয়েও অভিযোগ করা হয়েছে।
ওয়াসা ও এলজিইডিতে নিয়োগে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ
ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে আব্দুস সালামকে নিয়োগে ১০ কোটি টাকা ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ অনুসন্ধান করছে দুদক।
এ ছাড়া এলজিইডির সাবেক প্রধান প্রকৌশলী মো. আব্দুর রশীদ খানকে নিয়োগে ৫২ কোটি টাকা এবং গাজীপুর সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে আব্দুল লতিফ খানকে নিয়োগে ৬৫ কোটি টাকা লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে।
যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতিতেও কোটি কোটি টাকা লেনদেনের অভিযোগ অনুসন্ধান করা হচ্ছে।
চার দেশে ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ
অভিযোগে দাবি করা হয়েছে, দুবাইয়ে ৪ হাজার ৫০০ কোটি, সিঙ্গাপুরে ৩ হাজার কোটি, অস্ট্রেলিয়ায় ২ হাজার কোটি এবং সুইজারল্যান্ডে ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা পাচার করা হয়েছে। চার দেশে মোট অর্থপাচারের অভিযোগের পরিমাণ প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা।
এসব অর্থ দিয়ে বিদেশে বিলাসবহুল ভিলা কেনা ও ব্যবসায় বিনিয়োগের অভিযোগও করা হয়েছে। পাশাপাশি পর্তুগালে জমি কেনা, দুবাইয়ের একটি ব্যবসায়ী গ্রুপে বিনিয়োগ এবং সুইস ব্যাংকে অর্থ জমা রাখার অভিযোগ রয়েছে।
দুদকে দেওয়া আবেদনে আসিফ মাহমুদের দুই বোনের জামাই ও এক ভাগ্নের মাধ্যমে বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগও করা হয়েছে।
পরিবারের সদস্য ও সহযোগীদের বিরুদ্ধেও অভিযোগ
অভিযোগে আসিফ মাহমুদের বাবা বিল্লাল হোসেন এবং এপিএস মোয়াজ্জেম হোসেনের বিরুদ্ধেও ঠিকাদারদের একটি সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ ও স্থানীয় প্রশাসনে প্রভাব খাটিয়ে অর্থ সংগ্রহের অভিযোগ করা হয়েছে।
এ ছাড়া তাঁর পিও মাহফুজুল আলম ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে ঘুষ লেনদেনে তদবির ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে।
হেলিকপ্টারে কম্বল বিতরণের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় এবং বিমানবন্দরের মতো স্পর্শকাতর স্থানে গুলিভর্তি ব্যাগ নিয়ে প্রবেশের ঘটনাও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি পাঁচ তারকা হোটেলে নিয়মিত যাতায়াত এবং বিলাসবহুল ফ্ল্যাট ও গাড়ি ব্যবহারের বিষয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
আগের অনুসন্ধানে যেসব অভিযোগ
এর আগে আসিফ মাহমুদসহ সচিব মো. মাহবুব-উল-আলম, যুগ্মসচিব শেখ মোহাম্মদ জোবায়েদ হোসেন এবং উপসচিব মো. মাসুম আহমেদের বিরুদ্ধে পৃথক অনুসন্ধান শুরু করে দুদক।
ওই অনুসন্ধানে ৩৮ জন উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তার চলতি দায়িত্ব বাতিল ও পদায়নের মাধ্যমে ৭৬ লাখ টাকা, ১৫০ জন সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তার পদোন্নতিতে ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা এবং পদোন্নতির পর পছন্দের স্থানে পদায়নের জন্য ২ কোটি টাকা লেনদেনের অভিযোগ করা হয়।
এ ছাড়া যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের টেন্ডার, কেনাকাটা ও অন্যান্য কার্যক্রমে একটি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে দুর্নীতির অভিযোগও অনুসন্ধানের আওতায় রয়েছে।
দুদকের চার সদস্যের একটি অনুসন্ধান দল এসব অভিযোগ খতিয়ে দেখছে।
বড় পরিসরে অনুসন্ধান
নতুন অভিযোগে একাধিক মন্ত্রণালয়, সিটি করপোরেশন, উন্নয়ন প্রকল্প, নিয়োগ-পদায়ন এবং বিদেশে অর্থপাচারের বিষয় উঠে এসেছে। বিশেষ করে চার দেশে প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগসহ বিপুল অঙ্কের আর্থিক অনিয়মের তথ্য থাকায় বিষয়টি বড় পরিসরে অনুসন্ধান করছে দুদক।
অনুসন্ধান শেষে অভিযোগগুলোর সত্যতা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা সম্পর্কে পরবর্তী আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।


















