মক্কা চুক্তি প্রশ্নে হুট করে কোনো সিদ্ধান্ত নয়: ফরিদ হোসেন
- আপডেট সময় : ১১:০৭:২৪ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৩৪ বার পড়া হয়েছে
মক্কা চুক্তি অথবা Mecca joint defense agreement নিয়ে ঢাকা ফ্ল্যাশের ‘সাম্প্রতিক’ অনুষ্ঠানে কথা বলেছেন প্রতিষ্ঠানটির এডিটর-ইন-চিফ ফরিদ হোসেন। সাক্ষাতকারটি নিয়েছেন অভিজ্ঞ সাংবাদিক জুলহাস আলম।
জুলহাস আলম: মক্কা চুক্তি নিয়ে হঠাৎ এত আলোচনা কেন?
ফরিদ হোসেন: ধন্যবাদ আপনাকে। আপনি তো জানেন যে মধ্যপ্রাচ্য এখন একটা যুদ্ধের মধ্যে আছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইল ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ করছে। বেশ কয়েক মাস হয়ে গেল এই যুদ্ধ চলছে। যদিও ট্রাম্প বলেছিল যে যুদ্ধটা এক সপ্তাহের মধ্যে বা তারও কম সময়ে শেষ হয়ে যাবে। তো এই যুদ্ধ চলছে এবং এই যুদ্ধের প্রেক্ষাপট একটা আছে এমন পরিস্থিতিতে চলতি বছরের ৭ আগস্ট মক্কা চুক্তি হয় । এই চুক্তিতে আছে সৌদি আরব, তুরস্ক, পাকিস্তান। মূলত সৌদি আরবের নেতৃত্বেই এটা হয়েছে। তাদের উদ্যোগে এটা হয়েছে। আর আমরা যদি আরেকটু পিছনে যাই, সেপ্টেম্বরের দিকে পাকিস্তান এবং সৌদি আরব তারাও কিন্তু একটা স্ট্র্যাটেজিক ডিফেন্স এগ্রিমেন্ট (strategic defense agreement) করেছিল। সেটারই একটা সম্প্রসারিত রূপ হচ্ছে, মক্কা জয়েন্ট ডিফেন্স এগ্রিমেন্ট (Mecca joint defense agreement)। এই চুক্তির প্রেক্ষাপটটা অনেকটা এরকম। আরেকটি দিক হচ্ছে, ইরানের বিপ্লবের সময় থেকে মধ্যপ্রাচ্যে এমন এক পরিস্থিতি তৈরি হলো যে সুন্নি প্রধান দেশগুলো নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে শুরু করলো। সৌদি আরব এবং গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিল (Gulf Cooperation Council) এর দেশগুলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা ছাতার নিচে আসতে শুরু করলো। ওইসব এলাকায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অনেকগুলো যুদ্ধঘাঁটি আছে। তারা এগুলো দিয়ে থাকে। এবং এবার যখন যুদ্ধটা হলো ইরানের সঙ্গে ইরান সবাইকে চমকে দিল। সবাই ভেবেছিল যে ইরান আর কতদিন টিকে থাকতে পারবে ওখানে! ইসরাইল আছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আছে, মিসাইলের পর মিসাইল নিক্ষেপ হচ্ছে। তাদের নেতা খোমেনিকে হত্যা করা হয়েছে। শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিরা যারা যুদ্ধ পরিচালনা করছিল তারাও নিহত হয়েছে। সেসময় ট্রাম্প ইরানের জনগণকে বলেই দিয়েছিল যে আমার কাজ আমি করে দিয়েছি, তোমরা এখন রাস্তায় এসে সরকারকে উৎখাত করো। কিন্তু সেটা হয়নি। ইরান যে কাজটা করেছে তারা শুধু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে না পুরো বিশ্বকেই চমকে দিয়েছে। তাদের ড্রোন, তাদের মিসাইল একের পর এক ইসরাইলে হানা দিয়েছে। তারা মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে হানা দিয়েছে এবং তারপর কুয়েত থেকে শুরু করে ওমান, ইউএই সহ বিভিন্ন দেশগুলোতে। কাতারের তেল শোধনাগারসহ স্থাপনাগুলো অনেক ক্ষেত্রেই ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। এগুলো বলার মূল কারণ হচ্ছে, এই চুক্তির একটা মূল উদ্যোক্তা সৌদি আরব। অর্থায়ন (financing) করবে সৌদি আরব। আর তুরস্ক হচ্ছে এখন নতুন একটা খেলোয়াড় ( player) যারা উন্নত যুদ্ধ অস্ত্র তৈরি করছে। তারা বিভিন্ন দেশে ড্রোন, military equipment high tech দিতে চাইছে। আর পাকিস্তান তো সবসময়ই তাকিয়ে থাকে যে কোথায় যুদ্ধ লাগে, আর কিছু সৈন্য দিয়ে পাঠিয়ে অর্থ উপার্জন করতে পারবে তারা। পাকিস্তানের মূল ব্যাপারটা হচ্ছে সেখানে। যদিও তারা পারমাণবিক শক্তিধর, কিন্তু তারা ওখানে সৈন্য দিয়ে ফ্রন্টে যদি প্রয়োজন হয় সহযোগিতা করবে। কাজেই, তিনটা দেশ তিন রকমের উদ্দেশ্যে এক হয়েছে। এটা মূলত সৌদি আরবের নিজস্ব যে নিরাপত্তাহীনতা এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের যে প্রতিরক্ষা ছাতা (umbrella) দিয়ে আসছিল সেখানে শুধু সৌদি ওই অঞ্চলের অন্যান্য দেশগুলোকেও সেটা একটা অনিশ্চয়তার মুখে ফেলেছে।
জুলহাস আলম: ইরানের এই যে সক্ষমতা আমরা দেখলাম সেটার কারণে। একটি বিষয়, যদি এটাকে একটু ব্যাখ্যা (explain) করি, NATO’র যে স্ট্রাকচার আছে সেখানে বলা হয় যে NATO’র সদস্যভুক্ত কোন দেশ যদি আক্রমণের শিকার হয় তাহলে NATO সেখানে as a group joint response করবে। তো তারই আদলে বলা হচ্ছে যে এই তিনটি দেশ সৌদি আরব, তুরস্ক এবং পাকিস্তান তারা একই রকম একটা structure এর মধ্যে যাওয়ার। যদিও আমাদের কাছে এই চুক্তি সম্পর্কে এখনো অনেক কিছু আসলে অজানা। কিভাবে এটা operate করবে, সেগুলো নিয়ে এখনো প্রশ্ন আছে। কিন্তু বাস্তবতা কী আসলে এরকম যে Regional Power হিসেবে সৌদি আরব এবং ইরান তারা যে fight টা করছে তার মধ্যে পাকিস্তানকে জড়িয়ে সেটা কি আসলে তার তেমন কোন লাভ হবে মনে হয়?
ফরিদ হোসেন: আমি যা বললাম- পাকিস্তানকে কেন নেওয়া হয়েছে? পাকিস্তান কেন এখানে? এখানে আরেকটি বিষয় লক্ষনীয় এটাকে ইসলামিক NATO বলেও বলা হচ্ছে। কারণ হচ্ছে যে NATO এর article five এ যেটা বলা আছে NATO’ র মধ্যে একটা দেশও যদি বাইরের কোন দেশ দ্বারা আক্রান্ত হয় তাহলে সেটিকে সবগুলো দেশের উপরে আক্রমণ বলে মনে করা হবে। এবং এখন যদি কেউ ব্রিটেনকে আক্রমণ করে বা US কে আক্রমণ করে ন্যাটোর অন্য দেশগুলোও এটিকে তাদের উপরে আক্রমণ বলে মনে করবে। এখন সেটা তো আছে এবং এখানেও কিন্তু ওই ধারাটা আছে। ওই article five ধারার মতোই ধারা আছে। অর্থাৎ বাইরের কোনো দেশ দ্বারা এই তিনটি দেশের যেকোনো একটি দেশ যদি আক্রান্ত হয় তাহলে এই তিনটি দেশের উপরেই আক্রমণ করা হয়েছে বলে মনে করা হবে। এই ধরনেরই প্রতিরক্ষা চুক্তিগুলো এমনই হয়ে থাকে। কিন্তু বাস্তবে সবসময় যে NATO’র বেলায় এমন হয়েছে তা নয়। এখানে আবার দেখবেন যে তুরস্ক কিন্তু আবার NATO’র সদস্য। আর তাছাড়া বাস্তবে এমন নজির নেই যে, NATOর একটা দেশের উপর আক্রমণ করেছে বলে অন্য দেশগুলো হুড়মুড়িয়ে গিয়ে সেখানে আক্রমণ করেছে। এরকম কোন বিষয় নেই। কাজেই সেটি হয়তো চুক্তির ধারা হিসেবে থাকে। কিন্তু এখানে সৌদি আরব কিংবা অন্যান্য পশ্চিমা বিশ্লেষকরাও যা বলছে তা হলো- এটা নিয়ে যত কিছুই বলা হোক, মূল বিষয় হচ্ছে- সৌদি আরবের নিরাপত্তাহীনতার ব্যাপারটা। সৌদি আরব নিজের এই জায়গাটি feel করছে ইরানের উত্থানে। আপনি জানেন যে, পাকিস্তানের সাথে যে গত বছর চুক্তিটা করেছিল সে চুক্তিতে পাকিস্তান কিন্তু সৌদি আরবে সেনা মোতায়েন করে এবং তাদেরকে প্রশিক্ষণ দেয়। তাদের গার্ড যারা আছে সৌদি রাজপরিবার তারাও কিন্তু পাকিস্তানের থেকেই সৈন্য নিয়ে তারা সেখানে পাহারা দেয়। সৌদি আরবের সাথে পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের এই সম্পর্কটা আছে। এখানে তুরস্কের নতুন করে যে উৎসাহটা জন্ম নিয়েছে সেটা হচ্ছে যে তুরস্ক এখন একটি শক্তি ওখানে। তারা যে সমরাস্ত্র তৈরি করে সেটার। তুরস্কও কিন্তু বাংলাদেশেও বাজার খুঁজছে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে সরবরাহও করছে। সেটা অন্তর্বর্তী সরকারের সময় থেকেই শুরু হয়েছে। কাজেই ওই জায়গাটার মধ্যে সবাই যার যার জাতীয় স্বার্থ নিয়েই এই ধরনের কাজগুলো করে। সেটার কারণেই যার যার স্বার্থ এখানে তিনটি দেশ ওই জায়গায় এসে মিলিত হয়েছে।
জুলহাস আলম: একটি বিষয় সেটা হচ্ছে যে, মধ্যপ্রাচ্য তো প্রায় পাঁচ দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্রের যে প্রতিরক্ষা নীতি, তার যে strategic position সেটা follow করেই আসছিল। এই চুক্তির মাধ্যমে কি যুক্তরাষ্ট্রের সেই প্রভাব বলয়টা খর্বিত হচ্ছে নাকি সেটার ধারাবাহিকতা আরেকটা রূপ পাচ্ছে? কারণ পুরো প্রক্রিয়ায় আমরা ঠিক বুঝতে পারছি না যে অন্যান্য যেসব শক্তি আছে, বিশেষ করে চীন, ভারত, রাশিয়া তারা আসলে কোথায় আছে এখানে? তারা কোন জায়গা থেকে এই খেলাটা খেলছে? কারণ চীনের সাথে পাকিস্তানের ভালো সম্পর্ক, তুরস্কের সাথে এক ধরনের অন্যদের সম্পর্ক আছে। সৌদি আরবের সাথে আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্রের একটা দীর্ঘদিনের সম্পর্ক আছে। তাহলে এটা আসলে কোন format এ পড়ছে ঠিক আমি নিজেও একটু confused feel করছি?
ফরিদ হোসেন: যেটা আপনি শুরুতে বলেছিলেন একটা পর্যায়ে যে এটা আসলে কোন দিকে যাচ্ছে বা এটার বিস্তারিত রূপ কি নেবে সেটা এখনো পরিষ্কার না। তবে একটা তো বিষয় পরিষ্কার হয়েছে যে, সৌদি আরব সহ এই দেশগুলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উপরে আগের মত আর নির্ভর করতে পারছে না। কাজেই এই দিক থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বলয়ে কিছুটা ধাক্কা লেগেছে এবং যদিও আজকে ট্রাম্প প্রশাসন এই চুক্তিকে স্বাগত জানিয়েছে কিন্তু সে তো কিছু দিতে পারছে না। কারণ তার উপরে নির্ভর করে তো এরা চলতে পারছে না এবং তারা দেখল যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মিসাইল বা ড্রোন বিরোধী যেই অস্ত্রগুলো তাদের আছে সেগুলো কাজ করছে না। কাজেই এটি তো অবশ্যই খর্ব হবে এবং নতুন করে বলা হচ্ছে যে এখানে চীনের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্ক। কাজেই পাকিস্তান যেখানে যাচ্ছে সেখানে অনেক সময় মনে করা হচ্ছে যে চীনের সমর্থন সেখানে আছে। আবার রাশিয়ার সাথে ইরানের সম্পর্ক। এবং কদিন আগে যে সাংহাই কো-অপারেশনে যে দেশগুলোর মধ্যে যে শীর্ষ বৈঠক হলো কিরগিজস্তানে সেখানেও কিন্তু এই দেশগুলো আবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিরোধী একটা অবস্থান সংহত করেছে তারা ইরানের প্রশ্নে এবং ভারতসহ আপনি সেগুলোও দেখবেন। কাজেই এই ব্যাপারগুলো সেখানে আছে।
জুলহাস আলম: আমি খুব সহজ করে একটি জিনিস বুঝতে চাই। সেটি হচ্ছে যে ধরুন ভারত-পাকিস্তান তো চিরশত্রু আমরা জানি ঐতিহাসিকভাবে। কাল যদি ভারত-পাকিস্তানের সাথে যুদ্ধ লাগে, ভারত যদি কোনো কারণে পাকিস্তানে আক্রমণ করে অথবা পাকিস্তান যদি ভারতকে আক্রমণ করে তখন এই জোটের ঘটনাটা কি ঘটবে? আবার এদিকে দেখেন বাংলাদেশের সাথে চীনের সম্পর্ক ভালো। একভাবে আমাদের একটা বাণিজ্য সম্পর্ক আছে এবং চীন থেকে বাংলাদেশ সমরাস্ত্র নেয়। ভারতের সাথে বাংলাদেশের একটা অন্যরকম সম্পর্ক আছে। যদিও একটা টানাপোড়েন আছে কিন্তু বাস্তবতাকে অনেক কিছু তো অস্বীকার করা যায় না। তো এই বাস্তবতায় আসলে বাংলাদেশেও আগ্রহ দেখাচ্ছে মনে হচ্ছে। নানা রকম সরকারের যেসব স্টেটমেন্ট পররাষ্ট্রমন্ত্রী দিয়েছেন, যে আগ্রহ একটা আছে এটা join করে। যদিও বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিকভাবে সৌদি আরব, পাকিস্তান বা তুরস্ক থেকে এই চুক্তিতে এই জোটে যুক্ত করার জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু বলা হয় নাই। তাহলে scenario টা কী দাঁড়াবে আসলে?
ফরিদ হোসেন: এটি একটি মজার ব্যাপার। সাধারণভাবে আলোচনা হচ্ছে, যদি পাকিস্তান আক্রান্ত হয় তাহলে কি বাকি দুটো দেশ কি ভারতকে আক্রমণ করবে? ভারত দ্বারা যদি পাকিস্তান আক্রান্ত হয় বা এই scenarioটা বা সৌদি আরব যদি আক্রান্ত হয় অন্যরা করবে কিনা? ব্যাপারটা এরকম নাও হতে পারে। কারণ ধারাটা থাকলেও ধারাটার যে বাস্তবায়ন হবে সেরকম কিন্তু না। আপনি জানেন যে কদিন আগে কিন্তু ভারত পাকিস্তানের উপর আক্রমণ করেছিল। দুইটা দেশের যুদ্ধাবস্থা ছিল তখন কি সৌদি আরব? সৌদি আরবের সাথে কিন্তু পাকিস্তানের তখনও একটা strategic agreement এবং প্রতিরক্ষা চুক্তি কিন্তু ছিল। কিন্তু সৌদি আরব তো সেখানে আসে নাই। আবার আপনি যদি দেখেন সৌদি আরবের সাথে ভারতের সম্পর্ক সেটাও কিন্তু একটা দীর্ঘদিনের সম্পর্ক এবং সেখানেও কিন্তু সৌদি আরব ভারত যৌথ মহড়া করছে। তারা সামরিক মানে উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তারা ভারত সফর করছে। ভারত থেকেও তারা যাচ্ছে। ভারতের সাথে তাদের অর্থনৈতিক সম্পর্ক খুব ভালো এবং তাদের অনেক কর্মী ভারতেও অনেক কর্মী সৌদি আরবে কাজ করছে। কাজেই এই patternগুলো মানে যেভাবে বলা হয় যে ওই চুক্তিতে ধারাটা আছে বলেই সেভাবে হবে তেমনটা নয়।
জুলহাস আলম: তো আমি যদি এভাবে চিন্তা করি তাহলে বাংলাদেশের আসলে এখানে আগ্রহটা পজিটিভ? বা এটার মাধ্যমে বাংলাদেশ কোনওভাবে এখান থেকে gainer হতে পারে?
ফরিদ আহমেদ: বাংলাদেশ বর্তমান সরকার এই জোটে যেতে চাচ্ছে। তারা খুবই আগ্রহী এবং তারা একটা ডাকের আহ্বানে আছে। তারা একটা আমন্ত্রণের অপেক্ষায় আছে। ধরেন যেতে পারে কিন্তু কেন যাবে? এই যে একটা ব্যাপার আছে কারণ এখানে বাংলাদেশের কী লাভ হবে? বাংলাদেশের যে ব্যাপারটা হচ্ছে সেখানে হচ্ছে যে সরকার খুব উৎসাহী এবং তারা এই জোটটাকে ইতিবাচকভাবে দেখছে। এবং আপনি জানেন যে সেখানে আরেকটা জিনিস তারা করছে সেটা হচ্ছে একটা মুসলিম card play করার চেষ্টা করছে। আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সংসদে রুমিন ফারহানার একটা প্রশ্নের উত্তরে যা বলেছেন সেটি খুব তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি বলেছেন যে আমরা যাব, এটা আমরা ইতিবাচক হিসেবে দেখছি, যদি আমন্ত্রণ পাই তাহলে আমরা যাব। তিনি বলেন, মুসলিম পরিবারের ব্যাপার। আমরা কী করবো আমাদের ব্যাপার। বাইরের কারো কিছু বলার নাই। তাদের কোন উদ্বিগ্ন হওয়ারও কিছু ব্যাপার নাই। এই যে মুসলিম card play করছে এবং বাংলাদেশ কিন্তু মক্কা নামটাকে খুব পবিত্র মনে করে। agreement টাতে মক্কা যুক্ত থাকায় সেই অনুভূতিটাকে কাজে লাগানোর চেষ্টা চলছে। আমাদের সাধারণ মানুষের কাছে হয়তো গিয়ে জিজ্ঞেস করলে যে মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি হয়েছে। তারা হয়তো অনেকেই মনে করবে যে এটা মক্কাকে রক্ষা করার জন্য চুক্তি হয়েছে। সুতরাং বাংলাদেশ কেন যাবে না? মানে এই ধরনের ব্যাপার। কিন্তু দীর্ঘদিনের সাংবাদিকতায় একটা জিনিস আমরা জানি। সেটা হচ্ছে স্বাধীনতার পর থেকে কখনোই বাংলাদেশের যে নীতি ছিল সেটা হচ্ছে যে জোট নিরপেক্ষ নীতি। বাংলাদেশ কখনোই কোন প্রতিরক্ষা জোটের মধ্যে। সকলের সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে বৈরিতা নয়। যেটা সকলের সাথে বন্ধুত্ব করে না এটা যদিও এবং বর্তমান সরকারের বা বিএনপি যেটা বাংলাদেশ প্রথম তার সাথেও কিন্তু ওই যে আমাদের নীতিটা সেটা কিন্তু একই রকম যে আমার জাতীয় স্বার্থটা যেখানে আমি রক্ষিত হবে আমরা সেখানেই যাব। এখন বাংলাদেশের যে যারা উৎসাহী সরকারের দিক থেকে তারা মনে করছে যে আমরা ওখানে কিছু সৈন্য পাঠাতে পারব। আমরা আর্থিকভাবে সৌদি আরবকে আমি খুশি করতে পারব। মানে এই অর্থে যে সৌদি আরব আমার দিক থেকে আরও জনশক্তি নেবে। সৌদি আরবের কাছ থেকে আমি আর্থিক সাহায্য আরও পাব। বর্তমান যে পরিস্থিতি আছে সেখানে যেটা আমি ক্যাশ টাকা মানে অর্থ পাই সেটা পাব। এখন এই যে কত মানে চিন্তা থেকেই তারা করছে কিন্তু চিন্তাটার মধ্যে একটা ভ্রান্তি আছে। ভ্রান্তিটা হচ্ছে এই যে ওখানে যে এটা ছাড়া কি আমরা সৌদি আরবের কাছে পাচ্ছি না। সৌদি আরব তো এখনও আমাদের জনশক্তি রপ্তানির দিক থেকে একটা প্রধান দেশ। সৌদি আরব এখনও আমাদেরকে সাহায্য দিয়ে থাকে। সৌদি আরবে সৈন্য যে নেওয়ার ব্যাপারটা বা আমাদের শেখ হাসিনা সরকারও কিন্তু চেষ্টা করেছিল সৌদি আরবে রাজপরিবারের পাহারা দেওয়া বা ইত্যাদি করা সৈন্য পাঠানোর ব্যাপারটা কিন্তু সেখানে কিন্তু তাদের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্কটা এত বেশি গভীর যে সেখানে বাংলাদেশ গিয়ে যে খুব একটা পাত্তা পাবে তা না। কাজেই একদিক দিয়ে হচ্ছে যে আমরা একটা কি বলে যে যাওয়ার ক্ষেত্রে যতটা না আমাদের লাভ হবে তার চাইতে আমাদের রিস্কটা হচ্ছে বেশি। একটা কথা আমি বলি যেমন এই যে লোহিত সাগর, রেড সি সেখানে বাবল মানে যে স্ট্রেট আছে সেটা কিন্তু হুতিদের নিয়ন্ত্রণ। মানে তারা ওখানে ওখান দিয়ে জাহাজ গেলে পরে হুতিরা আক্রমণ করে। এখন ধরুন যে ইরান যদিও বলেছে যে এই প্যাকের ব্যাপারে বাংলাদেশ কি করবে না করবে সেটা নিয়ে তাদের কোন চিন্তা নাই। কিন্তু হুতিদের আছে। হুতিরা তো সৌদি আরবকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। কারণ হুতিদের বিরুদ্ধেও কিন্তু এই জোটের একটা বড়। এখন বাংলাদেশ এখানে যুক্ত হলে সেই বাংলাদেশের জাহাজ যদি ওখানে তারা আক্রমণ করে? প্রতিহিংসা পরায়ণ এক ধরনের আচরণ করতে পারে। হতে পারে, এই রিস্কগুলো আছে। এই জন্য দেখবেন যে সাম্প্রতিককালে একটা অংশ বলছে যে হুট করেই বলছে যে আমাদের যাওয়া উচিত। আমার এটা একটা কৌশলগত আমার লাভ হবে। অর্থনৈতিকভাবে আমি লাভবান হব। সামরিকভাবেও লাভবান হতে পারি। কিন্তু আরেক দল বলছে যে না। তুমি এই লাভটা দেওয়ার আগে একটু ভাবো যে ভাবিয়া করিও মানে। কাজ করিয়া ভাবিও না। এইরকম একটা ব্যাপার কিন্তু অনেকেই বলছে। তার মানে হচ্ছে যে, বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদে যে পররাষ্ট্র এবং প্রতিরক্ষা নীতি যেটি দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ অনুসরণ করে আসছে সেই বিবেচনাকে এক সাইডে রেখে, একপাশে রেখে যদি হুট করে এরকম কোন কিছুতে যুক্ত করা হয় তাহলে সেটার consequence টা একটু ভেবে নেয় উচিত বলে আপনি মনে করছেন। আমি একটু পিছনে যাই। আপনি তো এপি তে আছেন। এপি তে তখন আপনিও ছিলেন। দুই হাজার তিনে একটা ঘটনা বলি। দুই হাজার তিনে তখন কিন্তু বুশ প্রশাসন ইরাক আক্রমণ করল। ইরাক আক্রমণ করার পরে তখন তারা খুব সহজেই জয়ী হয়ে গেল। সাদ্দাম হোসেনকে তারা শেষ পর্যন্ত হত্যাই করা হলো। ২০০৩ সালের জুন মাসে। আপনার যদি মনে হয় US Secretary of State একদিনের জন্য কয়েক ঘণ্টার জন্য Colin Powell বাংলাদেশে এসেছিল। Colin Powell এর এই সফরটার মধ্যে একটা আমরা। যেহেতু আমিও তখন এপি তে কাজ করি। আমরা ভেতরের ব্যাপারটা জানতাম। তার একটা বড় ব্যাপার ছিল যে তখন ইরাক যুদ্ধ শেষ হয়ে যাওয়ার পরে তখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একটা সেখানে যে পুনর্গঠন বা তাদের ভাষায় পুনর্গঠন এবং কতগুলো humanitarian কাজ করার জন্য একটা মুসলিম দেশগুলোকে নিয়ে একটা বাহিনী যৌথ বাহিনী গড়ে তোলার চেষ্টা করছিল। সেখানে তারা প্রচণ্ডভাবে বাংলাদেশকে চাপ দিয়েছে যে তোমরাও সেটার সঙ্গে যুক্ত হও। তখন বেগম খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের। তো এই চাপটাকে তখন কিন্তু খুব দৃঢ়তার সঙ্গে বেগম খালেদা জিয়া এবং তখনকার বাংলাদেশ মোকাবেলা করেছে। তারা কিন্তু আপনি তখন Colin Powell একটা প্রেস কনফারেন্সও করল এবং সে তখন বলল যে না, আমরা কোন চাপ দিচ্ছি না। এই প্রশ্নটা সে উঠছিল। আমরা কোন চাপ দিচ্ছি না। আমরা কোন দাবিও করছি না। কিন্তু বাংলাদেশ যদি সেখানে সৈন্য পাঠায় যুক্ত হয় তাহলে আমরা তাকে স্বাগত জানাব। এবং ওর পরে পরে চাপটা কিন্তু তারা মানে বন্ধ করে দেয়নি। এরপরেই আপনি জানেন যে Rumsfeld আসছিল ওদের Defense Secretary। তো এই চেষ্টাগুলো তখন করেছিল। কিন্তু বাংলাদেশ কিন্তু তখন বলেছিল যে না আমরা যেতে পারি। এই ধরনের ক্ষেত্রে UN mandate ছাড়া আমরা কোথাও যেতে পারি না। এখন আমরা যেতে পারি একটা UN mandate যেটা বেগম খালেদা জিয়া যে শর্তটা দিয়েছিলেন UN mandate থাকতে হবে। দ্বিতীয়টা হচ্ছে যে ওখানকার ইরাকের একটা নির্বাচিত সরকার যদি আসে এবং তারা যদি আমাদের কাছে অনুরোধ করে। তখন চিন্তা করে যাবে। কারণ বাংলাদেশ তো UN mission এ তো লোক পাঠায়, বিভিন্ন দেশে সংঘাতপূর্ণ জায়গাগুলোতে। তো বাংলাদেশের সে অবস্থানটা কিন্তু সবাই প্রশংসা করেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে তো চাপ ছিল। এখন পর্যন্ত কিন্তু বাংলাদেশে ওই Colin Powell এর পরে আর কোন US Secretary of State বাংলাদেশ সফর করে নাই। তারপরও কিন্তু কোন Defense Secretary সফর করে নাই। তো বুঝতেই পারেন আপনি যে তারা কতটা গুরুত্বপূর্ণ তখন।
জুলহাস আলম: বাংলাদেশ রাষ্ট্র হিসেবে আমাদের যে global standing, আমাদের যে অবস্থান সেখানে জাতিসংঘের একটা কাভার নেয়া, তার একটা ছাতার নিচে থাকা সেটা আমাদের জন্য হয়তোবা নিরাপদই ছিল বলে এরকম একটা আমার মনে হয় যে খুব wise decision ছিল সেটা। এবং আমরা সম্প্রতি দেখেছি যে, ২০১৬ সালে Indo Pacific strategy যেটা যুক্তরাষ্ট্র প্রণয়ন করে এই অঞ্চলের জন্য, বিশেষ করে চীনকে ঠেকাও এরকম একটা strategy নিয়ে। সেখানে কিন্তু বাংলাদেশ, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র এবং চীন এই কোন জায়গায় নিজেকে place করবে সেটা নিয়ে। কিন্তু বাংলাদেশ আমার মনে হয় যে যথেষ্ট mature way তে তারা এটাকে handle করেছে।
আমরা আলোচনায় এই পর্যায়ে ইতি টানতে চাই। আমাদের আরও আলোচনা আমরা করতে চাই মক্কা চুক্তি নিয়ে। কারণ এটা একটি চলমান issue। সামনের মাসগুলোতে এটা নিয়ে আলোচনা হবে। আমরা আশা করি আমাদের জাতীয় সংসদ, আমাদের সরকারি দল, বিরোধী পক্ষ এবং civil society media সবাই এটা নিয়ে যে আলোচনা আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে সেই আলোচনাটি চলতে থাকুক। কারণ এটা চুলচেরা বিশ্লেষণ ছাড়া বাংলাদেশের যে অবস্থান স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে এমন কোন কিছুতে যুক্ত হওয়া হয়তোবা ঠিক হবে না। যদি ভুল হয়ে যায় সে ভুলের মাসুল অনেক বেশি আমাদেরকে গুনতে হবে। এও হতে পারে, কিন্তু যদি আমরা লাভবান হই, বাংলাদেশ রাষ্ট্র হিসেবে লাভবান হয় সেটি যেন জনগণের pulse টাকে বুঝে এবং আমাদের প্রয়োজনটাকে মাথায় রেখে সেদিকে যাওয়া হয়। আশা করি যে নীতি নির্ধারণকারীরা সেটি মাথায় রাখবেন। সকলকে ধন্যবাদ জানাই আজকের এই আলোচনায় যুক্ত হওয়ার জন্য। আগামী পর্বে আবারও দেখা হবে অন্য কোন বিষয় নিয়ে। ধন্যবাদ।










