[t4b-ticker] জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি: প্রভাব পড়েছে অর্থনীতির প্রতিটি স্তরে - Dhaka Flash



ব্রেকিং নিউজ:
আজ : ২৪শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১১ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, শুক্রবার প্রকাশ করা : এপ্রিল ২০, ২০২৬

  • কোন মন্তব্য নেই

    জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি: প্রভাব পড়েছে অর্থনীতির প্রতিটি স্তরে

    জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি: প্রভাব পড়েছে অর্থনীতির প্রতিটি স্তরে

    জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি: প্রভাব পড়েছে অর্থনীতির প্রতিটি স্তরে

    জয়ন্ত কর্মকার

    জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত এই বার্তাই দিচ্ছে যে সরকারের পক্ষে আর বাড়তি খরচ সহ্য করা সম্ভব হচ্ছে না। ডিজেল, অকটেন ও পেট্রোলের দাম লিটারপ্রতি ১৫ থেকে ২০ টাকা বাড়িয়ে সরকার কার্যত স্বীকার করে নিয়েছে যে, জ্বালানি খাতে ভর্তুকির বিশাল বোঝা বহন করা এখন আর সম্ভব নয়।

    অর্থনীতিবিদরা এই পদক্ষেপকে একটি প্রয়োজনীয় সংস্কার হিসেবে স্বাগত জানালেও এর ফলে সরাসরি অর্থনৈতিক চাপের মুখে পড়ছে দীর্ঘদিনের মূল্যস্ফীতিতে জর্জরিত সাধারণ মানুষ। বিশ্ববাজারের অস্থিরতা থেকে দেশীয় ভোক্তাদের সুরক্ষা দেওয়ার ক্ষেত্রে সরকারের সক্ষমতা যে ক্রমশ সংকুচিত হচ্ছে, এই সিদ্ধান্ত তা স্পষ্ট করে দিয়েছে।

    যুদ্ধকালীন পরিস্থিতি ও ভর্তুকির বোঝা

    বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বর্তমান পরিস্থিতিকে ‘যুদ্ধকালীন’ পরিস্থিতি হিসেবে বর্ণনা করেছেন। গতকাল সচিবালয়ে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, সাধারণ মানুষের জন্য দাম সহনীয় রাখতে বাংলাদেশ এতদিন আমদানি মূল্যের চেয়ে কম দামে তেল বিক্রি করেছে। কিন্তু জ্বালানি তেল কিনতে হয় বৈদেশিক মুদ্রায়, তাই দাম সামান্য বাড়িয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হচ্ছে।

    অর্থনীতিবিদদের বিশ্লেষণ

    সিপিডির অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, এই দাম সমন্বয় ক্রমবর্ধমান আর্থিক চাপ ও সরকারের সীমিত নীতিগত বিকল্পের প্রতিফলন। দীর্ঘদিনের উচ্চ মূল্যস্ফীতির পর এই দাম বৃদ্ধি সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা আরও কমিয়ে দেবে এবং পরিবহন, শিল্প ও ব্যবসার প্রতিটি খাতে ব্যয়ের বোঝা বাড়াবে।

    বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন সরকারের পদক্ষেপকে সমর্থন করে বলেন, ভর্তুকির কারণে রাষ্ট্রীয় কোষাগারের অর্থ অপচয় হচ্ছিল, যার সুফল সাধারণ মানুষের চেয়ে সচ্ছল শ্রেণী বেশি পেত। দাম সমন্বয় না করলে সরকারকে কর বাড়াতে, ঋণ নিতে বা অন্যান্য খাতের বরাদ্দ কমাতে হতো। তিনি নিম্নআয়ের পরিবারগুলোর জন্য সরাসরি নগদ অর্থ সহায়তা বা ভাউচার দেওয়ার পরামর্শ দেন।

    জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম মনে করেন, এই মূল্যবৃদ্ধি যৌক্তিক এবং আরও আগেই কার্যকর করা উচিত ছিল। তবে দাম বাড়লে পরিবহন ও উৎপাদন খরচ বেড়ে যায়, যা মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করে।

    ভোক্তাদের সংগঠনের প্রতিক্রিয়া

    কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানিবিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম এই সিদ্ধান্তকে ‘বিশ্বাসভঙ্গ’ বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, মাসের মাঝামাঝি দাম বাড়ানো হবে না বলে সরকার আশ্বস্ত দিলেও তা লঙ্ঘন করা হয়েছে। এছাড়া বেসরকারি সরবরাহকারীদের মজুতদারি এখন স্পষ্ট, কারণ দাম বাড়ার সঙ্গেই বাজারে জ্বালানির সরবরাহ বেড়েছে।

    তিনি প্রশ্ন তোলেন, দেশে উৎপাদিত পেট্রোল ও অকটেনের দাম কেন আমদানিকৃত জ্বালানির দামের সমান রাখা হয়েছে।

    কৃষি খাতের ওপর প্রভাব

    কৃষি অর্থনীতিবিদ জাহাঙ্গীর আলম খান কৃষি খাতের জন্য মারাত্মক ঝুঁকির কথা তুলে ধরেন। বোরো মৌসুমে সেচের চাহিদা সবচেয়ে বেশি। ডিজেলের দাম বাড়ায় সেচ খরচ বেড়েছে, অন্যদিকে উত্তরাঞ্চলের ফিলিং স্টেশনগুলোতে জ্বালানি সংকট ও দীর্ঘ লাইনের কারণে ফসল উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। কেরোসিনের দাম বাড়ায় গ্রামীণ পরিবারগুলোর ওপর চাপও বাড়বে।

    যাতায়াত ভাড়া বাড়ানোর তোড়জোড়

    জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পরিপ্রেক্ষিতে সড়ক ও নৌপথ—উভয় খাতেই যাতায়াত ভাড়া বৃদ্ধির তোড়জোড় শুরু হয়েছে। বিআরটিএ সভা করলেও ভাড়া পুনঃনির্ধারণে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। পরিবহন মালিক সমিতিগুলো মহানগরে প্রতি কিলোমিটার ভাড়া ৪ টাকা এবং দূরপাল্লার বাসের ক্ষেত্রে ৩ টাকা ৮০ পয়সা করার প্রস্তাব দিতে পারে। এতে ভাড়া সর্বোচ্চ ৬৪ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে।

    অন্যদিকে, বিআইডব্লিউটিএ লঞ্চের ভাড়া ৩৬ থেকে ৪২ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে।

    জ্বালানি সরবরাহ বৃদ্ধির নির্দেশ

    গতকাল বিপিসি রাষ্ট্রীয় তিন বিতরণকারী সংস্থাকে ডিজেল ও পেট্রোলের সরবরাহ ১০ শতাংশ এবং অকটেনের সরবরাহ ২০ শতাংশ বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছে। এপ্রিলের প্রথম ১৭ দিনের তুলনায় ডিজেলের সরবরাহ ১৭.৫ শতাংশ, অকটেন ২৫.৯ শতাংশ এবং পেট্রোল ২০.৬ শতাংশ বাড়ানো হচ্ছে।