মে মাসে সারা দেশে মব সহিংসতা ও গণপিটুনিতে ৩১ জন এবং রাজনৈতিক সহিংসতা ও দলীয় কোন্দলে ৫ জনসহ মোট ৩৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া রাজনৈতিক সহিংসতায় আহত হয়েছেন ২৮৯ জনেরও বেশি মানুষ। মানবাধিকার সংগঠন 'হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস)' ২০২৬ সালের মে মাসের মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে।
শুক্রবার (৫ জুন) গণমাধ্যমে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে সংস্থাটি জানায়, দেশের ১৬টি জাতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ এবং এইচআরএসএস-এর সংগৃহীত তথ্য ও ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং রিপোর্টের ভিত্তিতে এই প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে মব সহিংসতা ও গণপিটুনির ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলা হয়, মে মাসে চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, বাকবিতণ্ডা, আধিপত্য বিস্তার ও ধর্মীয় অবমাননার মতো নানা অভিযোগে ৬৬টি গণপিটুনির ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় অন্তত ৩১ জন নিহত এবং ৬৮ জন আহত হয়েছেন।
মে মাসে দেশে মোট ৬৪টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এতে নিহত হয়েছেন ৫ জন এবং আহত হয়েছেন ২৮৯ জন। হতাহতের সংখ্যা এপ্রিল মাসের তুলনায় কিছুটা কমলেও সহিংসতার ভয়াবহতা বিদ্যমান। নিহত ৫ জনের মধ্যে বিএনপির ১ জন, জামায়াতের ১ জন, পার্বত্য চট্টগ্রামের দল ইউপিডিএফ-এর ২ জন এবং ১ জন সাধারণ নারী রয়েছেন।
রাজনৈতিক সহিংসতার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলে ১৮টি ঘটনায় ১১৪ জন আহত হয়েছেন। বিএনপি-জামায়াত সংঘর্ষে ১০টি ঘটনায় ৪৯ জন আহত ও ১ জন নিহত হয়েছেন। বিএনপি-আওয়ামী লীগ সংঘাতের ১৪টি ঘটনায় ৭২ জন আহত ও ২ জন নিহত হয়েছেন। এছাড়া বিএনপি-এনসিপি ও অন্যান্য দলের সঙ্গে সংঘর্ষেও বেশ কয়েকজন হতাহত হয়েছেন। এ মাসে অন্তত ১৩৪টি বাড়িঘর, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও দলীয় কার্যালয়ে হামলা ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে।
মে মাসে রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের নামে ২৩টিরও বেশি মামলা হয়েছে, যেখানে ৪০৫ জনের নাম উল্লেখসহ প্রায় ৯৩২ জনকে অজ্ঞাত আসামি করা হয়েছে। মোট ৩৩১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যার মধ্যে আওয়ামী লীগের ২৪৬ জন, বিএনপির ৬৪ জন, জামায়াতের ১২ জন এবং এনসিপির ৯ জন সদস্য রয়েছেন। এছাড়া যৌথ বাহিনীর বিশেষ অভিযানে ১,৯৩৫ জনেরও বেশি ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যাদের অধিকাংশই আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ-সংগঠনের নেতা-কর্মী এবং উগ্রপন্থী সংগঠনের সদস্য।
মে মাসে ৩৯টি ঘটনায় ৭৮ জন সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ৪২ জন আহত ও ১৮ জন লাঞ্ছিত হয়েছেন। অন্যদিকে, মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের ১১টি ঘটনায় ৬ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সমালোচনা করে ফেসবুকে পোস্ট দেওয়ায় ১ জন এবং বিএনপি নেতা-কর্মীদের সমালোচনার দায়ে ৬ জনকে আটক করা হয়েছে। সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ-২০২৫-এর অধীনে পৃথক ৫টি মামলায় ১২ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে।
মে মাসে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে বিএসএফ-এর হামলায় ৬ জন নিহত ও ২০ জন আহত হয়েছেন। এছাড়া মিয়ানমার সীমান্তে স্থলমাইন বিস্ফোরণে ৩ জন নিহত হয়েছেন। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর ৩টি হামলার ঘটনায় ৫ জন আহত হয়েছেন এবং দুটি মাজারে হামলার ঘটনা ঘটেছে।
সংস্থাটি জানায়, মে মাসে ৩০৫ জন নারী ও শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ৮৩ জন নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছেন (৫৭ জনই শিশু)। ১৭ জন নারী ও শিশু গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন। এছাড়া পারিবারিক সহিংসতায় ৬৩ জন নারী নিহত হয়েছেন। অত্যন্ত উদ্বেগজনক বিষয় হলো, মে মাসে ২১৫ জন শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে, যার মধ্যে ৫৬ জন প্রাণ হারিয়েছে।
এইচআরএসএস-এর নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম বলেন, "মাসজুড়ে রাজনৈতিক সহিংসতা, গণপিটুনি, মব জাস্টিস এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের ঘটনাগুলো মানবাধিকার পরিস্থিতির চরম অবনতিকে নির্দেশ করে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মতপ্রকাশের কারণে গ্রেপ্তার ও হয়রানি নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।" তিনি সরকারকে মানবাধিকার রক্ষায় আরও জবাবদিহিমূলক পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানান।
নিজস্ব প্রতিনিধি, ঢাকা ফ্ল্যাশ