নিজস্ব প্রতিনিধি, ঢাকা ফ্ল্যাশ
বাংলাদেশের সীমান্ত লাগোয়া ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনে টানা ১৫ বছর ধরে ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেসকে ধসিয়ে দিয়ে ইতিহাস গড়েছে বিজেপি। বিপুল এ জয়ের কারণ নিয়ে শুরু হয়েছে নানা বিশ্লেষণ। ভারতের অনলাইন সংবাদমাধ্যম দ্য প্রিন্টের কন্ট্রিবিউটিং এডিটর দ্বীপ হালদার মনে করছেন, বিজেপির এই জয়ে বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
তার মতে, ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর হিন্দুদের ওপর ‘নির্যাতন’, বাংলাদেশে শিকড় থাকা মতুয়া সম্প্রদায়ের ভোট, এবং ‘অবৈধ বাংলাদেশি অভিবাসীদের’ কারণে জনতাত্ত্বিক কাঠামো বদলে যাওয়ার ভয়—সবই কাজ করেছে বিজেপির এই জয়ে।
‘লাল রাজ্যকে গেরুয়া করতে প্রয়োজন ছিল শক্তিশালী গল্প’
সোমবার দ্য প্রিন্টে প্রকাশিত বিশ্লেষণে দ্বীপ হালদার লেখেন, “বিজেপির ‘অবৈধ বাংলাদেশি অভিবাসী’ বয়ানের বিপরীতে এ রাজ্যে দীর্ঘকাল ধরে নির্বাচনি আলোচনায় হিন্দু-মুসলিম মেরুকরণকে দূরে রাখা হয়েছিল, কিন্তু এবার সেটি কাজ করেনি। মূলত একটি লাল (বামপন্থি) রাজ্যকে গেরুয়া রঙে বদলে দিতে একটি শক্তিশালী গল্পের প্রয়োজন ছিল, যা ব্যালট বক্সের মাধ্যমে এক ধরনের রঙিন বিপ্লব ঘটিয়ে দিয়েছে।”
তিনি উল্লেখ করেন, টানা ৩৪ বছর ক্ষমতায় থাকার পর ২০১১ সালে বামফ্রন্ট হারলেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অধীনেও পশ্চিমবঙ্গ অনেকাংশেই ‘বামপন্থি’ ভাবধারায় রয়ে গিয়েছিল। তৃণমূলের জনকল্যাণমূলক প্রকল্প ও বড় শিল্প বিপক্ষে অবস্থান দলটিকে ‘বামের চেয়েও বেশি বাম’ হিসেবে পরিচিত করেছে।
হাসিনার পতন ও কলকাতার বিক্ষোভ
দ্বীপ হালদার তাঁর বিশ্লেষণে উল্লেখ করেন, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে কলকাতায় বাংলাদেশ উপ-হাইকমিশনের বাইরে হিন্দু সন্ন্যাসী ও হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলোর নেতৃত্বে এক বিশাল বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। তাদের দাবি ছিল, ময়মনসিংহের ভালুকায় পিটিয়ে ও পুড়িয়ে হত্যা করা পোশাক শ্রমিক দীপু চন্দ্র দাসের বিচার। এই হত্যা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না—বাংলাদেশে হিন্দুদের ওপর ‘হামলার খবর’ বিশ্বজুড়ে শিরোনাম হয় এবং পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক উত্তাপ বাড়িয়ে দেয়।
বিক্ষোভকারীরা ব্যারিকেড ভেঙে ফেলার চেষ্টা করলে পুলিশের সঙ্গে ধস্তাধস্তি শুরু হয়। ওই সময় বিক্ষোভকারীদের চিৎকার করতে শোনা যায়—‘এই পুলিশ রাজ্যের পুলিশ নয়, এরা বাংলাদেশি পুলিশ। এই পুলিশ সন্ন্যাসীদের লাঠি দিয়ে পিটিয়েছে এবং প্রতিবাদী নারীদের কাপড় ছিঁড়ে ফেলেছে।’
শুভেন্দু অধিকারীর ‘অবৈধ অভিবাসী’ বয়ান
দ্বীপ হালদার লেখেন, বিজেপির যুব শাখার রাজ্য সহ-সভাপতি অরুণ শাহ দ্য প্রিন্টকে বলেন, “দীপু চন্দ্র দাসকে শুধু হিন্দু হওয়ার কারণে হত্যার প্রতিবাদ করায় কলকাতার বুকে গেরুয়া বসনধারী সন্ন্যাসীদের জনসমক্ষে পেটানো হচ্ছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কার পক্ষে ছিলেন?”
অন্যদিকে বিরোধীদলনেতা শুভেন্দু অধিকারী তৎক্ষণাৎ একটি প্রতিনিধি দল নিয়ে বাংলাদেশ উপ-হাইকমিশনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে দেখা করেন এবং বাংলাদেশে হিন্দু নির্যাতন বন্ধের দাবি জানান। হিন্দু বিক্ষোভকারীদের ওপর পুলিশি অ্যাকশন নিয়ে তিনি মমতা সরকারকে তীব্র আক্রমণ করেন।
এই ঘটনা শুভেন্দু অধিকারীকে তাঁর বয়ান প্রতিষ্ঠিত করতে সাহায্য করে যে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আশীর্বাদেই পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকায় সোয়া কোটি অবৈধ অভিবাসী রয়েছে।
মতুয়া ফ্যাক্টর: ‘স্মৃতির রাজনীতি’
ঊনবিংশ শতাব্দীতে পূর্ববঙ্গে (অধুনা বাংলাদেশ) হরিচাঁদ ঠাকুরের হাত ধরে প্রতিষ্ঠিত মতুয়া সম্প্রদায়ও এবারের নির্বাচনে বড় ভূমিকা পালন করেছে বলে মনে করেন দ্বীপ হালদার। মতুয়ারা পশ্চিমবঙ্গের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে প্রভাবশালী একটি তফশিলি জাতি গোষ্ঠী।
যুক্তরাজ্যের সাসেক্স ইউনিভার্সিটির নৃবিজ্ঞানী অয়ন গুহ দ্য প্রিন্টকে বলেন, “ভোটার তালিকা সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় মতুয়াদের একটি বড় অংশের নাম বাদ পড়ায় ক্ষোভ থাকলেও তারা বিজেপিকেই বেছে নিয়েছে। এর প্রধান কারণ বাংলাদেশ।”
অয়ন গুহ একে ‘স্মৃতির রাজনীতি’ আখ্যা দিয়ে বলেন, “বাংলাদেশের পরিস্থিতি বিজেপির স্মৃতির রাজনীতিকে গতি দিয়েছে। এটি পূর্ব পাকিস্তান বা বাংলাদেশে মতুয়া-নমশূদ্রদের ওপর ধর্মীয় নির্যাতনের স্মৃতিকে উসকে দেয়—যাতে তাদের নিম্নবর্ণের গোষ্ঠী হিসেবে নয়, বরং নির্যাতিত হিন্দু শরণার্থী হিসেবে ঐক্যবদ্ধ করা যায়।”
তিনি আরও জানান, মতুয়া সম্প্রদায়ের যাদের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছে, তারাও বিজেপির নির্বাচনি প্রচারে সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছে—এই আশায় যে বিজেপি তাদের নাগরিকত্ব ও ভোটাধিকার নিশ্চিত করবে।
বহুত্ববাদী পশ্চিমবঙ্গে মেরুকরণের মোড়
দ্বীপ হালদার তাঁর বিশ্লেষণের উপসংহারে লেখেন, পশ্চিমবঙ্গের বহুত্ববাদী সমাজে হিন্দু-মুসলিম মেরুকরণ আগে সেভাবে কাজ না করলেও, প্রতিবেশী বাংলাদেশের ঘটনাবলী রাজ্যের রাজনীতিকে একটি বড় মোড় দিয়েছে এবং বিজেপিকে ক্ষমতার স্বাদ পাইয়ে দিয়েছে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: জয়ন্ত কর্মকার।
ঠিকানা: বাসা নং- ৪৬০/এ এভিনিউ-৭, রোড ৬, মিরপুর ডিওএইচএস, ঢাকা-১২১৬
ইমেইল: editor@dhakaflash.com নিউজ ইমেইল: news@dhakaflash.com
© স্বত্ব ঢাকা ফ্ল্যাশ ২০২৪ এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।