বাংলাদেশে মার্কিন রাষ্ট্রদূতের কার্যক্রম নিয়ে যেসব গুরুতর অভিযোগ উঠেছে, তার সারসংক্ষেপ নিচে তুলে ধরা হলো—
প্রথমত, রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেনের বিরুদ্ধে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের ওপর ‘অযাচিত খবরদারি’ ও মাত্রাতিরিক্ত প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে, যা প্রায়শই কূটনৈতিক প্রটোকলকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে।
দ্বিতীয়ত, ‘রিসিপ্রোকাল ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্ট’ (আরটিএ) চুক্তিকে বাংলাদেশের জন্য একটি ফাঁদ হিসেবে দেখা হচ্ছে, যার ফলশ্রুতিতে মার্কিন প্রতিষ্ঠান বোয়িংয়ের সঙ্গে ৩৭ হাজার কোটি টাকার বিশাল উড়োজাহাজ ক্রয়চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে।
তৃতীয়ত, জ্বালানি খাতে এক্সিলারেট ও শেভরনের মতো মার্কিন কোম্পানিগুলোর আধিপত্য বিস্তার এবং কৃষিখাতে কর্পোরেট নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার আশঙ্কা প্রবল হচ্ছে।
সর্বশেষে, মার্কিন রাষ্ট্রদূতের এই অতিসক্রিয়তাকে কূটনৈতিক শিষ্টাচারের লঙ্ঘন হিসেবে দেখা হচ্ছে, কারণ তিনি মন্ত্রী ও সামরিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে মাত্রাতিরিক্ত বৈঠক করছেন, যা দেশের সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
গত ১০ জানুয়ারি ট্রেসি অ্যান জ্যাকবসনের স্থলাভিষিক্ত হয়ে ঢাকায় আসার পর ক্রিস্টেনসেনের তৎপরতা বিশেষভাবে লক্ষণীয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানসহ প্রায় দুই ডজন মন্ত্রী ও উপদেষ্টার সঙ্গে তিনি বৈঠক করেছেন। এমনকি তিন বাহিনীর প্রধান—সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, নৌবাহিনী প্রধান অ্যাডমিরাল মোহাম্মদ নাজমুল হাসান এবং বিমানবাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খানের সঙ্গেও নিয়মিত বৈঠক করছেন। বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, এই ঘনঘন ও উচ্চপর্যায়ের বৈঠক কূটনৈতিক শিষ্টাচারের লঙ্ঘন এবং অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের সামিল।
সংশ্লিষ্ট মহলের অভিযোগ, বাংলাদেশের শক্তিশালী ও স্থানীয় ভিত্তির অর্থনীতিকে ভেঙে একটি ঋণনির্ভর অর্থনীতি চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে যুক্তরাষ্ট্র। তার অংশ হিসেবে বাংলাদেশকে গত ৯ ফেব্রুয়ারি ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ‘রিসিপ্রোকাল ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্ট’ (আরটিএ) বা পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তির ফাঁদে ফেলা হয়েছে। এই চুক্তির ফলে বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের অনুমোদনের বাধ্যবাধকতা সৃষ্টি হয়েছে। চুক্তি বাতিলের ৬০ দিনের সুযোগ থাকলেও, বিএনপি সরকার গত ৩০ এপ্রিল মার্কিন প্রতিষ্ঠান বোয়িংয়ের সঙ্গে ৩৭ হাজার কোটি টাকার উড়োজাহাজ কেনার চুক্তির মাধ্যমে পরোক্ষভাবে আরটিএ বাস্তবায়ন করেছে।
গত ৩ মার্চ মার্কিন রাষ্ট্রদূত বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম রিতার সঙ্গে সাক্ষাতের পরই বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস বোয়িংয়ের সঙ্গে এই বিশাল চুক্তি চূড়ান্ত করার দিকে দ্রুত এগিয়ে যায়, যা ৩০ এপ্রিল আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরিত হয়। উল্লেখ্য, চুক্তির এক সপ্তাহ আগেই র্যাংস গ্রুপের ব্যবসায়ী রুমি হোসেনকে বিমানের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। এই সময়ক্রম নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
গত ১২ এপ্রিল ক্রিস্টেনসেন পরিবেশমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টুর সঙ্গে দেখা করেন এবং জানান যে শেভরন ও এক্সিলারেট এনার্জির মতো প্রতিষ্ঠান গ্যাস উৎপাদন বাড়াতে প্রস্তুত। এই দুটি কোম্পানিতেই মিন্টুর মাল্টিমোড গ্রুপের শেয়ার রয়েছে। এছাড়া, ২০২৪ সালের সরকার পরিবর্তনে যুক্ত থাকার গুঞ্জন থাকা সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত পিটার হাস বর্তমানে এক্সিলারেট বাংলাদেশের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। এর আগে ইউনূস সরকার এক্সিলারেটের সঙ্গে উচ্চমূল্যের দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি চুক্তি করেছিল এবং বর্তমানে সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধানের চুক্তিও অপেক্ষমাণ। এসব ঘটনা জ্বালানি খাতে মার্কিন স্বার্থের গভীর প্রভাবের ইঙ্গিত দেয়।
গত ২৭ এপ্রিল মার্কিন রাষ্ট্রদূত বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গে বৈঠক করে গ্রামীণ অবকাঠামো, কৃষি ও সমবায়ে মার্কিন ‘দক্ষতা’ কাজে লাগানোর আহ্বান জানান। এর আগে ৩ মার্চ কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিনুর রশিদের সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেন ক্রিস্টেনসেন। আমিনুর রশিদ আমদানি-রপ্তানির সঙ্গে যুক্ত লালমাই গ্রুপের নেতৃত্বে রয়েছেন। বিশ্লেষকদের ধারণা, আরটিএ চুক্তির আওতায় বাংলাদেশকে বছরে ৩৫০ কোটি ডলারের মার্কিন কৃষিপণ্য আমদানি করতে হবে। পাশাপাশি, আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের মাধ্যমে কৃষি ভর্তুকি প্রত্যাহারের চাপ দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র মূলত বাংলাদেশের ক্ষুদ্র কৃষকদের সরিয়ে বিশাল বাজারকে কর্পোরেট কৃষি ব্যবস্থার অধীনে আনতে চায়।
অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীসহ স্বরাষ্ট্র, পররাষ্ট্র, বাণিজ্য, স্বাস্থ্য, আইন, শিক্ষা, তথ্য ও যোগাযোগমন্ত্রীসহ প্রায় ডজনখানেক মন্ত্রীর সঙ্গে ক্রিস্টেনসেন ধারাবাহিকভাবে বৈঠক করেছেন। মার্কিন বিশেষ দূত চার্লস হার্ডারকে সঙ্গে নিয়ে জ্বালানি মন্ত্রী ও নিরাপত্তা উপদেষ্টাদের সঙ্গে ‘নিরাপত্তা কৌশল’ নিয়েও বৈঠক করেছেন তিনি। গত ৫ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে তাঁর বৈঠককে ক্রিস্টেনসেন ‘ফলপ্রসূ’ বলে উল্লেখ করেছিলেন।
বোয়িং চুক্তির পর মার্কিন রাষ্ট্রদূতের এসব বৈঠক বিএনপি সরকারের জন্য কতটা ‘ফলপ্রসূ’ হচ্ছে, তা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রশ্ন উঠেছে। বিশ্লেষকেরা আশঙ্কা করছেন, আরটিএ চুক্তি বাংলাদেশকে এমন এক কোণঠাসা অবস্থায় ফেলেছে, যেখান থেকে বেরিয়ে আসা কঠিন। তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার যুক্তরাষ্ট্রের এই প্রবল উপস্থিতিতে দৃশ্যত নির্বিকার থাকলেও, এই অতিমাত্রার নির্ভরতা ভবিষ্যতে সরকারের জন্য ‘বুমেরাং’ হতে পারে এবং দেশের সার্বভৌমত্ব দুর্বল হতে পারে।