জয়ন্ত কর্মকার, ঢাকা ফ্ল্যাশ
পশ্চিমবঙ্গে টানা ৯৬ ঘণ্টার টানটান উত্তেজনার অবসান ঘটতে চলেছে আগামীকাল সোমবার। দুপুরের মধ্যেই সবাই জেনে যাবেন, শেষ হাসি কে হাসছেন—নরেন্দ্র মোদি, না মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। রাত পোহালেই উঠে যাচ্ছে স্বাধীনতা-উত্তর পশ্চিমবঙ্গের সবচেয়ে তীব্র প্রতিযোগিতার নাটকের পর্দা। এমন ‘কী হয়, কী হয়’ উত্তেজনা আর কখনো দেখা যায়নি। ফলে গোটা ভারতের নজর এখন এই রাজ্যে।
শুধু তাই নয়, চট্টগ্রামে মাছি আটকে পড়ার মতো এপার বাংলার দিকেই তাকিয়ে আছে বাংলাদেশও। সীমান্তপারে রাজনৈতিক পালাবদলে দুই দেশের সম্পর্কের রসায়নে কী বদল আসতে পারে, সেই ভাবনা গভীরভাবে আচ্ছন্ন করে রেখেছে পদ্মাপারের মানুষকে। নইলে গত চার দিন ধরে ‘কী হতে চলেছে’—এই প্রশ্ন দূরভাষে অবিরাম ভেসে আসত না।
গণনার প্রস্তুতি ও পাহারা
স্থানীয় সময় সোমবার সকাল ৮টায় শুরু হচ্ছে ভোটগণনা। প্রথমে গণনা হবে পোস্টাল ব্যালট, পরে খোলা হবে ইভিএম। ২০২১ সালে রাজ্যে ১০৮টি কেন্দ্রে গণনা হয়েছিল। এবার নির্বাচন কমিশন প্রথমে সেই সংখ্যা কমিয়ে ৮৭ করে, পরে আরও ১০টি কেন্দ্র কমিয়ে তা ৭৭-তে নামিয়ে আনে। কলকাতার ১১টি আসনের গণনা হবে পাঁচটি কেন্দ্রে।
রায়বন্দি ইভিএম ভোট শেষে প্রার্থীদের এজেন্টদের সামনে ‘সিল’ করে বিভিন্ন এলাকার স্ট্রং রুমে রাখা হয়েছে। গত চার দিন ধরে তৃণমূল কংগ্রেস ও বিজেপির নেতা-কর্মীরা পালা করে স্ট্রং রুম পাহারা দিচ্ছেন, সঙ্গে আছে কেন্দ্রীয় বাহিনীও।
গত শনিবার এক ভার্চুয়াল বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় কর্মীদের নির্দেশ দেন। তিনি বলেন, শাসকের এজেন্টরা ভোট লুটের চেষ্টায় কোনো ফাঁক রাখবে না, কিন্তু একটি ভোটও চুরি হতে দেওয়া যাবে না। গণনাকেন্দ্রের বাইরে প্রতিটি কেন্দ্রে টানা সীমানার বাইরে পাঁচ হাজার কর্মী রাখতে বলা হয়েছে, যেখানে ছাত্র, যুব, মহিলা ও ট্রেড ইউনিয়নের সদস্যরা থাকবেন। কাছের সব পার্টি অফিস সকাল থেকে খোলা রাখতে বলা হয়েছে। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের অফিস রোববার সকাল থেকেই লাগাতার খোলা থাকবে; কোনো গড়বড় দেখলেই সেখানে জানানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বিজেপির কৌশল ও কর্মসূচি
বিজেপিও পিছিয়ে নেই। রাজ্য নেতৃত্ব ‘পরিবর্তনের হাওয়া’ অনুভব করে কর্মীদের ‘সব রকমভাবে’ প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দিয়েছে। তবে তৃণমূলের তুলনায় তাদের তৎপরতা তুলনামূলক কম, কারণ তারা মনে করে, নির্বাচন কমিশন ও কেন্দ্রীয় বাহিনী শান্তিপূর্ণ ভোট পর্ব নিশ্চিত করেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক রাজ্য বিজেপি নেতা রোববার প্রথম আলোকে বলেন, ‘এবারের ভোট আগের সব ভোট থেকে আলাদা। এই প্রথম নির্বাচন কমিশন নির্বিঘ্নে ভোটদান নিশ্চিত করতে পেরেছে। গণনায় তার প্রতিফলন ঘটবে।’ তিনি আরও জানান, কর্মীদের সারা দিন মন্দিরে মন্দিরে পরিবর্তন কামনায় প্রার্থনা করতে বলা হয়েছে।
স্ট্রং রুম পাহারায় বিজেপি প্রধান দায়িত্ব দিয়েছে নারী কর্মীদের। তৃণমূলের তুলনায় বিজেপির ভোট-শিক্ষিত কর্মী ও বুথ এজেন্টের সংখ্যা ও অভিজ্ঞতা কম। সেই ঘাটতি পূরণে তারা কয়েক দিন ধরে বিশেষ প্রশিক্ষণ শিবির ও কর্মশালার আয়োজন করেছে। বিজেপির আশঙ্কা, তৃণমূল গণনাকে ঘিরে গোলমাল সৃষ্টি করতে পারে। তাই কেন্দ্রীয় বাহিনীর সঙ্গে কর্মীদের ‘সমন্বয় রাখতে’ বলা হয়েছে।
জল্পনা আর জটিল সমীকরণ
গত চার দিন ধরে রাজ্য ও দেশের সর্বত্র একটাই জল্পনা—শেষ পর্যন্ত বাজি কে মারবেন? নিশ্চিত ভবিষ্যদ্বাণী এতটাই অনিশ্চিত যে ‘অ্যাক্সিস মাই ইন্ডিয়া’ ও ‘সি ভোটার’-এর মতো প্রতিষ্ঠিত সংস্থাও কোনো ইঙ্গিত দেয়নি। বুথফেরত সমীক্ষায় সবাই মোটামুটি একমত যে আসামে বিজেপি, কেরলে ইউডিএফ, তামিলনাড়ুতে ডিএমকে-কংগ্রেস জোট ও পুদুচেরিতে এনআর কংগ্রেস-বিজেপি জোট জিতছে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে অধিকাংশ সমীক্ষক বিজেপিকে এগিয়ে রাখলেও ফল নিয়ে সংশয় প্রবল।
এসআইআর কার পক্ষে যাচ্ছে? নির্বাচন কমিশনের ‘হয়রানি’ কি বাঙালির জাত্যাভিমানে আঘাত দিয়েছে? তৃণমূল ‘বাঙালি বনাম বহিরাগত’ স্লোগানে কতটা সফল? পরিবর্তনের হাওয়া কি শহরের পাশাপাশি গ্রাম ও মফস্বলেও বহমান? সংখ্যালঘু মুসলমান ও নারীরা কি এবারও ‘দিদি’র পক্ষে দৃঢ়? বঙ্গবাসী কি ১৫ বছরের শাসনে বীতশ্রদ্ধ?—এসব প্রশ্নের নিশ্চিত জবাব কারও কাছে নেই।
ভোটের উচ্চহার ও তৃণমূলের সাংগঠনিক শক্তির মোকাবিলায় কেন্দ্রীয় বাহিনী ও কমিশন কতটা সফল—তা নিয়েও চলছে সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ। পাইয়ে দেওয়ার রাজনীতিতে সাধারণ মানুষ মোদির চেয়ে দিদির ওপরই বেশি ভরসা রেখেছেন কি না, কেউ তা নিশ্চিত করে বলতে পারছেন না। ফলে শিক্ষিত মধ্য ও উচ্চবিত্ত হিন্দু বাঙালি পরিবর্তনের পক্ষে মোদির হাত ধরলেও, সেই হাওয়া গোটা রাজ্যে সমানভাবে বইছে কি না—তা এখনও অনিশ্চিত। তাই পেন্ডুলাম দুলেই চলেছে।
মতামত: দোলাচলের চিত্র
‘সি ভোটার’-এর কর্ণধার যশোবন্ত দেশমুখ এই অনিশ্চয়তা স্বীকার করে বলেছেন, ‘একদিকে সরকারবিরোধী মনোভাবের প্রাবল্য, অন্যদিকে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিপুল জনপ্রিয়তা। যে রাজ্যে এক-তৃতীয়াংশ ভোটার সংখ্যালঘু মুসলমান, যাঁরা এখনো বিজেপির প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দিদিকেই আঁকড়ে রেখেছেন, তাঁদের সঙ্গে নারীদের সমর্থন অটুট থাকলে পরিবর্তনের হাওয়া কি ভোটের ফল উলটে দিতে পারে? এই ধাঁধার উত্তর মিলবে আগামীকাল দুপুরের মধ্যেই।’
ততক্ষণ সবাইকে অপেক্ষা করতে হবে—টানটান উত্তেজনার মধ্যেই।
সম্পাদক ও প্রকাশক: জয়ন্ত কর্মকার।
ঠিকানা: বাসা নং- ৪৬০/এ এভিনিউ-৭, রোড ৬, মিরপুর ডিওএইচএস, ঢাকা-১২১৬
ইমেইল: editor@dhakaflash.com নিউজ ইমেইল: news@dhakaflash.com
© স্বত্ব ঢাকা ফ্ল্যাশ ২০২৪ এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।