এসএসসি পরীক্ষায় নজিরবিহীন কড়াকড়ি, স্বচ্ছতা নিশ্চিতে কঠোর নির্দেশনা ও শাস্তির বিধান
এসএসসি পরীক্ষায় নজিরবিহীন কড়াকড়ি, স্বচ্ছতা নিশ্চিতে কঠোর নির্দেশনা ও শাস্তির বিধান

নিজস্ব প্রতিনিধি, ঢাকা ফ্ল্যাশ
আগামী পরশু (২১ এপ্রিল) থেকে শুরু হতে যাওয়া এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় নকলমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে এবং ব্যবহারিক পরীক্ষার স্বচ্ছতা বজায় রাখতে বেশ কয়েকটি কঠোর নির্দেশনা জারি করেছে শিক্ষা বোর্ড।
ব্যবহারিক পরীক্ষায় বড় পরিবর্তন
ব্যবহারিক পরীক্ষায় স্বচ্ছতা ফেরাতে আমূল পরিবর্তন আনা হয়েছে। বিগত বছরের ‘গড়পড়তা’ নম্বর দেওয়ার সংস্কৃতি বন্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে:
-
ল্যাব সুবিধা বাধ্যতামূলক: নিজস্ব ল্যাবরেটরি সুবিধা নেই এমন কেন্দ্রে ব্যবহারিক পরীক্ষা নেওয়া যাবে না।
-
একই কেন্দ্র: তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক পরীক্ষা একই কেন্দ্রে নিতে হবে।
-
পরীক্ষক নিয়োগে নিষেধাজ্ঞা: নিজ বিদ্যালয়ের শিক্ষককে সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীদের ‘বহিরাগত পরীক্ষক’ হিসেবে নিয়োগ দেওয়া যাবে না।
-
উত্তরপত্র জমা দিতে হবে হাতে-হাতে: পরীক্ষা শেষ হওয়ার সাত দিনের মধ্যে উত্তরপত্র ও নম্বর ফর্দ ডাকযোগে নয়, সরাসরি বোর্ডে জমা দিতে হবে। অন্যথায় ফলাফল স্থগিত ও আইনি ব্যবস্থার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।
নকল রোধে জিরো টলারেন্স ও তিন স্তরের শাস্তি
পরীক্ষার হলে নকল বন্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি কার্যকর করা হচ্ছে। ২০টি সুনির্দিষ্ট অপরাধের তালিকা করে শাস্তিকে তিন স্তরে ভাগ করা হয়েছে:
প্রথম স্তর (পরীক্ষা বাতিল): পরীক্ষাকক্ষে কথা বলা, ডেস্ক বা পোশাকে লেখা, ক্যালকুলেটরে তথ্য লুকানো, মোবাইল বা ইলেকট্রনিক ডিভাইস রাখা।
দ্বিতীয় স্তর (পরীক্ষা বাতিল + ১ বছর নিষিদ্ধ): প্রশ্ন বা উত্তরপত্র হলের বাইরে পাচার, কক্ষ প্রত্যবেক্ষককে হুমকি, উত্তরপত্র জমা না দিয়ে হল ত্যাগ।
তৃতীয় স্তর (২ বছরের জন্য বহিষ্কার + মামলা): অন্যের হয়ে পরীক্ষা দেওয়া (প্রক্সি), রোল নম্বর ইচ্ছাকৃত পরিবর্তন, উত্তরপত্র বিনিময়, কেন্দ্রের কর্মকর্তা-কর্মচারীকে শারীরিক আক্রমণ বা অস্ত্র প্রদর্শন। এ ছাড়া এসব অপরাধে থানায় জিডি ও ফৌজদারি মামলা করা হবে।
ভিজিল্যান্স টিম মাঠে
ডিজিটাল জালিয়াতি রোধে বিশেষ ক্ষমতাসম্পন্ন ‘ভিজিল্যান্স টিম’ মাঠে নামানো হচ্ছে। তারা যেকোনো সময় পরীক্ষা কেন্দ্রে ঝটিকা অভিযান চালাতে পারবে এবং অনিয়ম শনাক্তে তাৎক্ষণিক আইনি ব্যবস্থা নিতে পারবে।
সময় বিভাজনে নতুন নিয়ম
সৃজনশীল (সিকিউ) ও বহুনির্বাচনি (এমসিকিউ) পরীক্ষার মধ্যে কোনো বিরতি থাকবে না:
-
১০০ নম্বরের পরীক্ষায়: এমসিকিউ (৩০ নম্বর) – ৩০ মিনিট, সৃজনশীল (৭০ নম্বর) – ২ ঘণ্টা ৩০ মিনিট।
-
ব্যবহারিক আছে এমন বিষয়ে: এমসিকিউ (২৫ নম্বর) – ২৫ মিনিট, সৃজনশীল (৫০ নম্বর) – ২ ঘণ্টা ৩৫ মিনিট।
-
বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীরা: অতিরিক্ত ৪৫ মিনিট পাবেন এবং চাইলে অষ্টম শ্রেণির শ্রুতিলেখক রাখতে পারবেন।
আসন বিন্যাস ও কক্ষ প্রত্যবেক্ষক
-
৫-৬ ফুট লম্বা বেঞ্চে সর্বোচ্চ ২ জন, ৪ ফুট লম্বা বেঞ্চে মাত্র ১ জন পরীক্ষার্থী বসতে পারবেন।
-
একই বিদ্যালয়ের পরীক্ষার্থীদের পরস্পরের কাছাকাছি আসন দেওয়া যাবে না।
-
কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নিজস্ব কেন্দ্রে পরীক্ষা দিতে পারবে না।
-
প্রতি ২০ জন পরীক্ষার্থীর জন্য ১ জন কক্ষ প্রত্যবেক্ষক বাধ্যতামূলক।
শিক্ষকদের জন্যও কঠোর হুঁশিয়ারি
ওএমআর শিট বা উত্তরপত্রের কভার পৃষ্ঠায় তথ্যগত ভুল ও কক্ষ প্রত্যবেক্ষকের অবহেলা প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের বক্তব্য
মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাবোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক প্রফেসর এস এম কামাল উদ্দিন হায়দার বলেন, “ব্যবহারিক পরীক্ষা নিয়ে অতীতে নানা অভিযোগ এসেছে। এবার আমরা সেই সুযোগ পুরোপুরি বন্ধ করে দিচ্ছি। যে কেন্দ্রে পর্যাপ্ত ল্যাব সুবিধা নেই, সেখানে কোনো ব্যবহারিক পরীক্ষা হবে না। এবারের প্র্যাকটিক্যাল হবে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ এবং মেধার ভিত্তিতে।”
তিনি আরও জানান, ‘গড়পড়তা’ নম্বর দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই এবং শিক্ষকরা নিজ স্কুলের শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন করতে পারবেন না। লক্ষ্য তাত্ত্বিক পরীক্ষার মতো ব্যবহারিকেও প্রকৃত মূল্যায়ন নিশ্চিত করা।